উপ-সম্পাদকীয় প্রবাস বাংলা বিনোদন

স্মৃতিময় ঈদ

সারা বিশ্ব মুসলমানদের জন্য প্রতি বছর পবিত্র মাহে রমজান যেমন বয়ে আনে  রহমত, মাগফেরাত, নাজাত আর এই রমজান মাসের শেষে বিশাল আকাশ জুড়ে উঁকি দেয় চাঁদ, সেই উঁকি দেয়া চাঁদ দেখেই সকল মুসলমানদের মধ্যে খুশির বার্তা নিয়ে আসে ঈদ।  যাকে বলা ঈদুল ফিতর।

যে ঈদে ছোট,  বড়,  গরীব, দুঃখী  সকলেই  আর কিছু না হলেও নতুন পোশাক পড়ে  ঈদ গাহে গিয়ে সকলেই মিলে এক সাথে  ঈদের নামাজ আদায় করে,  নামাজ শেষে ঈদের মাঠে  একে অপরের সাথে হাসিমুখে  কোলাকুলি, আনন্দভাগাভাগি করে থাকে।

ঈদ গাহের পাশেই বসে ছোট খাটো প্রানবন্ত মেলা, যেখানে ছোট ছোট শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও  দেখা যায়,  অনেকেই  বেলুন, বাশি,  চানাচুর দোকান নিয়ে বসে,  শিশুরা বাশি, বেলুন, হাতে নতুন চুড়ি পড়ে পুরো ঈদগা চষে বেড়ায়,  গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে সেমাই, মিস্টি খেয়ে স্থানীয় বাজারের চায়ের দোকানে গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মিলিত, আলাপচারিতার পাশাপাশি চায়ের কাপে চুমুক,  আহা সেকি আনন্দ।

আমি যখন বাবার সাথে ঈদের ছুটিতে চট্রগ্রাম থেকে বাড়িতে ঈদ করতে আসতাম তখন গ্রামের বন্ধুদের সাথে নিয়ে ঈদ গাহের মাঠে চানাচুর এর দোকান নিয়ে বসতাম,  ৫০ টাকা চালান খাটালেই যতেস্ট ছিলো,সকাল বেলা চেয়ার আর টেবিল দিয়ে জায়গা দখল করতাম,   আমার বন্ধু সায়েম, প্রিন্স, শামিম সবাই মিলেই ব্যবসা করতাম, নামাজ শেষে বড় ভাইয়ারা এসেই চানাচুর ক্রয় করতেন এক টাকার জায়গায় ঈদ বলে ১০/২০ টাকা দিয়ে দিতেন ঘন্টার মধ্যেই বেচাকেনা শেষ,  প্রায় দিগুন লাভ হতো।

এরপর  দল বেধে মা,বাবাকে সালাম করেই ঈদের সালামি নিয়ে  এই ঘরে, ও ঘরে জেঠা, জেঠিমা, চাচা, চাচি, ভাই, ভাবীদের  সালাম করে তাদের কাছ থেকে ঈদের বকশিস বা ঈদ সালামি  নিতাম।

সেই সালামি পেয়ে  বন্ধুরা মিলে বেড়াতে যেতাম, এক সাথে সিনেমা দেখতাম। কতো আনন্দ করতাম,  গ্রামের সবুজ মাঠ চষে বেড়াতাম। চাঁদপুর পদ্মা, মেঘনা আর ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে বসে ঢেউয়ের খেলা দেখতাম। আজ সবি আছে ঠিক সেই  আগের মতই।  নেই আমি, আমরা।

আজ আর নেই সেই দিন গুলি,  নেই সেই বন্ধু,  নেই সেই সমাজ, নেই সেই পরিবেশ। আজ ঈদ কাটে চার দেয়ালের মাঝে বন্ধি,  যে যার মত করেই কাটায় ঈদ,  বড় লোকের ঈদ হয় দেশ, বিদেশ আর গাড়ি ভ্রমনে, আর গরীবের ঈদ গ্রামের লোকালয়ে নিজেদের মত করেই। সেই সব দিনের কথা মনে হলে দুচোখ বেয়ে পানি ঝরে।

হাজারো স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দী মনের মাঝে,  ঈদ আনন্দ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বেদনা।  হেসে খেলেই বড় হয়েছি,  বাবার হাত ধরেই গিয়েছি গ্রাম থেকে শহরে, আবার শহর থেকে সেই ঈদ গাহে।  বাবা ঘরের কোনে দাড়িয়ে ডাকতেন কইরে বাপ দ্রুত আয় ঈদের মাঠে যাবো,  নতুন পোশাক পড়ে বাবার হাত ধরে, মায়ের মমতা নিয়ে গিয়েছি ঈদের মাঠে।  আজ কই সেই বাবা, নেই, নেই, নেই বাবা নেই।  ২০০৮ সালে বাবা, মায়ের দোয়া নিয়ে এসেছি প্রবাসে। সেই থেকেই ঈদ কাটে সৌদি আরবে,  নেই সেই আনন্দ,  নেই সেই স্বজন,একাকি ঈদ।

হঠাৎ বাবা ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে,  যেখান থেকে আজব্দি কেউ ফিরে আসেনি, আসেনা,আসবেও না।  সবি মহান আল্লাহর লিলা খেলা। আজ ঈদ যায়, ঈদ আসে কইরে বাপ বলে কেউ ডাকেনা,  বাবার মুখে মিস্টি ডাক আর শুনতে পাইনা।  হাজার চিৎকার করলেও বাবা সাড়া দেয়না।  স্মৃতিময় ঈদ গুলির কথা মনে হলেই আমার প্রিয় বাবার কথা মনে হয়।  হে আল্লাহ আমার মতো যাদের বাবা এই জগতসংসারে নেই তাদের সবাইকে জান্নাতবাসী করুন।  একদিন আমাকে, আপনাকেও যেতে হবে এই একি পথে।  তাই যাবার আগেই যেনো বেশি বেশি নেক আমল আর ভালো কাজ গুলি করতে পারি আল্লাহ পাক সেই তাওফিক দিন সবাইকে।

লেখক পরিচিতি – প্রবাসী সাংবাদিক, নাট্যসংগঠক,  লেখক ও মানবাধিকার কর্মী।

Sharing is caring!

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares