চাঁদপুর- ৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে ২০০১ সালে প্রথম ভোটযুদ্ধে নামেন তিনি। প্রথমবার চক্রান্তের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে আবারও তাকেই পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেবার অল্প কিছু ভোটে হারেন তিনি, কিন্তু দমে যাননি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকন্যা তাকে বেছে নেন সৎ এবং যোগ্য প্রার্থী হিসেবে। এবার তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রথিতযশা সাংবাদিক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শফিকুর রহমান।

তার বর্ণাঢ্য জীবন সংগ্রাম নিয়ে লিখেছেন জাগো নিউজের প্রতিবেদক রিফাত কান্তি সেন-

বেড়ে ওঠা: চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা গ্রামে বিগত শতাব্দীর মধ্যচল্লিশে বাবা মৌলভী আবদুল হামিদ এবং মা আয়েশা খাতুনের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেন শফিকুর রহমান। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠাই ছিল তার কাছে বেশ আনন্দের। ছোটবেলা থেকেই মা, মাটি আর দেশের প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। গ্রামের মানুষের প্রতি ছিল বেশ টান। দেশ সেবার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী।

শিক্ষা জীবন: বর্ণাঢ্য তার শিক্ষা জীবন। পড়েছেন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসায়। ১৯৬৫ সালে ফরিদগঞ্জের আলীয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল (হাদিস) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে চাঁদপুর কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭০ সালে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে ঢাবি থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। যার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২-৭৩ সালে। তার সহপাঠী ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, কবি নির্মলেন্দু গুণ, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনসহ বেশ ক’জন গুণী ব্যক্তি।

এছাড়া ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ডের থমসন ফাউন্ডেশনের আয়োজনে সাংবাদিকতার ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ (সার্টিফিকেট কোর্স) অর্জন করেন। ১৯৮৫ সালে জাপানের টোকিও ফেলোশিপ, জার্নালিস্টিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯১ সালে জার্মানির বার্লিনের জার্নালিস্টিক ইনিস্টিটিউট স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৭০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে ১৯৭৩ সালে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। এছাড়া ইত্তেফাকে সিনিয়র রিপোর্টার, বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০০২ সালে ইত্তেফাক থেকে অবসর নিয়ে কলাম লেখা শুরু করেন। দৈনিক আজকের কাগজ ও দৈনিক ভোরের কাগজে নিয়মিত কলাম লিখতেন। এছাড়া ২০০৯ সাল থেকে দৈনিক জনকণ্ঠের চতুরঙ্গ পাতায় প্রতি শনিবার কলাম লিখেছেন। বিদেশি গণমাধ্যমেও লেখা ছাপা হয় তার। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার ইংরেজি অনলাইন নিউজ পেপার ‘এশিয়ান ট্রিবিউন’র অনিয়মিত কলামিস্ট।

মুক্তিযোদ্ধা: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন শফিকুর রহমান। দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। চাঁদপুর মহকুমা জোনাল বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) লিডার আবদুল মমিন খান মাখনের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন।

রাজনৈতিক জীবন: ছাত্র রাজনীতির মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে আসেন তিনি। ১৯৬৫ সালে ফরিদগঞ্জের আলীয়া মাদ্রাসায় পড়াকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৬ সালে চাঁদপুর কলেজ ছাত্রলীগের কার্যকরী সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময়ই ফরিদগঞ্জ ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মোহাম্মদ মহসিন হলের ছাত্রলীগের সদস্য, সহ-সাহিত্য সম্পাদক এবং সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছয় দফা আন্দোলনে যোগ দেন। অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণসহ ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সরাসরি শ্রোতা ছিলেন।

রাজনৈতিক প্রাপ্তি: ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের জনসভায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘শফিক সাহেব আমার সহপাঠী, বন্ধু। আমরা একসঙ্গে ক্যাম্পাসে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন করেছি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত সাংবাদিক। জানি, ফরিদগঞ্জ অবহেলিত জনপদ, আপনারা শফিক সাহেবকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠান। ফরিদগঞ্জের উন্নয়নের দায়িত্ব আমি নিলাম।’

সংসদ নির্বাচন: শফিকুর রহমান ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-৪ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৮ সালেও তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। তবে দু’বারই হেরে যান। সবশেষে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ের মুকুট নিয়ে ঘরে ফেরেন।

সমাজ সেবা: তিনি ফরিদগঞ্জের উন্নয়নের জন্য বরাদ্ধকৃত প্রতিটি কাজ তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করবেন। সাধারণ জনগণের কাছাকাছি থেকে ফরিদগঞ্জের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যেতে চান। মাদকের বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে যুবসমাজকে মুক্ত করতে চান।