অনলাইন ডেস্ক:

দেশ তোলপাড় করা নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকার হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে ১৫ মাস পর স্বাক্ষর করেছেন দুই বিচারপতি। রায়টি এখন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এ প্রতিবেদন লেখার সময় রায় প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আলোচিত সাত খুন মামলায় হাইকোর্টের রায় ৮০০ পৃষ্ঠার। বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায়ে স্বাক্ষর করেছেন। সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সরোয়ার কাজল জানান, রায় প্রদানকারী দুই বিচারপতি স্বাক্ষর দিয়েছেন। এখন রায়টি ওয়েবসাইটে প্রকাশ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।

গত বছর ২২ আগস্ট আসামিদের করা আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সাত খুন মামলায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক সিটি কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানাসহ ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১১ জনকে। ৯ জনকে দেওয়া বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডের রায়ও বহাল থাকে হাইকোর্টের রায়ে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, সাত খুনের ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। র্যাব একটি এলিট ফোর্স। র্যাবের প্রতি মানুষের আস্থা আছে। তাদের দায়িত্ব হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। তারা জনগণের নিরাপত্তা দেওয়া ও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক কাজ করেছে। কিন্তু এ বাহিনীর কতিপয় সদস্যের কারণে গোটা বাহিনীকে দায়ী করা যায় না। তারা যে অপরাধ করেছে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রাপ্য।

রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন— সাবেক কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ (চাকরিচ্যুত) ও সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (চাকরিচ্যুত) আরিফ হোসেন, সাবেক লেফট্যানেন্ট কমান্ডার (চাকরিচ্যুত) এম মাসুদ রানা, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্সনায়েক হিরা মিয়া, ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম। এদের মধ্যে চাকরিচ্যুত লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা।

যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া আসামিরা হলেন— সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, সার্জেন্ট এনামুল কবির, নূর হোসেনের সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান চার্চিল, সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান ও জামালউদ্দিন সরদার।

২০১৭ সালের ২৬ জুলাই হাইকোর্টের একই বেঞ্চ রায়ের জন্য ১৩ আগস্ট দিন ধার্য রেখেছিলেন। এদিন রায়ের তারিখ পিছিয়ে ২২ আগস্ট নতুন দিন ধার্য করা হলে ওইদিনই রায় ঘোষণা হয়। ওই বছরের ২২ মে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়।

সাত খুনের দুই মামলায় ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি মোট ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার ৩৫ আসামির মধ্যে ২৩ জন কারাবন্দি। এদের মধ্যে ২১ জন নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবাববন্দি দেন। এ মামলায় ১০৬ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার পর প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনায় তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে তার গাড়িচালক মিজানুর রহমান দীপু জবানবন্দি দিতে রাজি হননি।

নিম্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ৩৫ আসামির মধ্যে ১২ জন পলাতক। গ্রেফতার হওয়া ২৩ জনের মধ্যে ১৮ জনকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে ও পাঁচজনকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৬ জনের মধ্যে গ্রেফতার ও আত্মসমর্পণ করে কারাগারে থাকা ২০ জন নিয়মিত জেল আপিল করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের লিঙ্ক রোডের লামাপাড়া এলাকায় র্যাবের সদস্যরা চেকপোস্ট বসিয়ে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের গাড়ি থামান। র্যাব গাড়ি থেকে নজরুল ইসলাম, তার তিন সহযোগী ও গাড়িচালককে তুলে নিয়ে যায়। এ সময়ে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন আইনজীবী চন্দন সরকার। তিনি অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় তাকে ও তার গাড়িচালককেও র্যাব তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের সবাইকে হত্যা করে ওই রাতেই পেট কেটে এবং ইটের বস্তা বেঁধে সবার লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

পরদিন নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ছয়জনকে আসামি করে ফতুল্লা থানায় অপহরণের মামলা করেন। যেটি পরে হত্যা মামলায় পরিণত হয়। ৭ মে চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে ফতুল্লা থানায় আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

Share Button