নতুনেরডাক অনলাইন :

জাতিসংঘ ও লন্ডন সফর শেষে গত রোববার বিএনপির প্রতিনিধিদলের দেশে ফেরার পরই ‘খালেদা জিয়াকে ছাড়াই নির্বাচনে যাবে বিএনপি’ এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে রাজনীতিতে। দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, মহাসচিবকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনে ডেকে নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে প্রয়োজনে তাকে কারাগারে রেখেই নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছেন—এমন কথা শোনা যাচ্ছে। পরদিন গত সোমবার রাতে এ নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত মার্চেও একই নির্দেশনা এসেছিল লন্ডন থেকে। তবে গতকাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেনি।

অবশ্য বিএনপির এমন নির্বাচনী বার্তা আমলে নিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের নীতিনির্ধারণী নেতাদের মতে, নির্বাচনী কৌশল নিয়ে একেক সময় একেক তথ্য প্রচারের মধ্য দিয়ে দলটি মূলত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। এর আগে খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না—এমন কথা বলেছিল। এখন বলছে, খালেদা জিয়াকে ছাড়াই নির্বাচনে যাওয়ার কথা। এই কৌশলের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে নিজেদের নির্বাচনে আনার ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ আশা করছে। তবে বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, বিএনপি এখন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ও নির্বাচনী দাবি-দাওয়া পূরণের ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিয়েছে। নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই। তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ক্ষমতাসীনরা এমনও বলছেন, নির্বাচনী দাবির ব্যাপারে বিএনপির সরকারের সঙ্গে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এবার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। সংবিধানের বাইরে যাবে না সরকার। বিএনপি কখনো আন্দোলনের কথা বলে, কখনো খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলে সরকারের কাছে থেকে আলোচনার প্রস্তাব পেতে চায়। কিন্তু এবার কোনো আলোচনা বা সংলাপ হবে না। গত নির্বাচনের আগে সংলাপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনকালীন সরকারেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা কোনোটাই রাখেনি। বরং প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকে অপমান করেছে। নির্বাচন বর্জন করেছে। জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে গেছে। সুতরাং এবার বিএনপিকে নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ও অস্তিত্ব রক্ষার কারণেই নির্বাচনে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেটা তাদের ব্যাপার। এতে আওয়ামী লীগের মাথাব্যথা নেই। তাদের রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি হিসাব করেই তারা সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমাদের কাছে তথ্য আছে খালেদা জিয়া মুক্ত না হলেও বিএনপি এবার নির্বাচনে অংশ নেবে।

খালেদা জিয়াকে ছাড়াই নির্বাচন—বিএনপির এমন নির্বাচনী বার্তার ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত স্পষ্ট কিছু বলেননি দলের নেতারা। তবে গতকাল রাতে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকে দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। এই মুহূর্তে তার মুক্তিই দলের প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারেও প্রস্তুতি রাখার কথা বলেছেন দলের নেতারা। নেতাদের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনী দাবি আদায় ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ—সবকিছুই একসঙ্গে চলবে। সময় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—দল কোন প্রক্রিয়ায় কীভাবে নির্বাচনে যাবে।

এ ব্যাপারে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপির বক্তব্য পরিষ্কার। খালেদা জিয়াকে ছাড়া দল নির্বাচনে যাবে না। আমরা মনে করি, নির্বাচনী পরিবেশ এলে খালেদা জিয়া এমনিতেই মুক্তি পাবেন। বিএনপি নির্বাচনের পথেই আছে। কে কি বলল, তার চেয়ে বড় বিষয় খালেদা জিয়ার মুক্তি।

মূলত বিএনপির নির্বাচনে আসা না আসা নিয়েই এখন পর্যন্ত আবর্তিত নির্বাচনী রাজনীতি। নির্বাচনে আসার ব্যাপারে দলটি এখন পর্যন্ত তাদের কৌশল স্পষ্ট করছে না। কখনো বলছে, খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচন নয়; কখনো বলছে মুক্তি না পেলে তাকে কারাগারে রেখেই নির্বাচনে যাবে। আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে নানা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও বিএনপির কৌশল অনুযায়ী নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ করেছে। খালেদা জিয়া মুক্তি পাক বা না পাক বিএনপি নির্বাচনে গেলে এক ধরনের কৌশল প্রয়োগ করবে ক্ষমতাসীনরা। আর নির্বাচনে না গেলে অন্য কৌশল রয়েছে তাদের। তবে বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, অস্তিত্ব রক্ষার কারণেই বিএনপিকে এবার নির্বাচনে যেতে হবে। দলের ভেতর সে প্রস্তুতিও চলছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেক দফায় ক্ষমতায় যেতে বদ্ধপরিকর।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, দলের পক্ষ থেকে জোট-মহাজোটের শরিকদের বলা হয়েছে, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে এক রকম আর না নিলে আরেক রকম কৌশল অবলম্বন করা হবে। অর্থাৎ বিএনপির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে দল ও দলের মিত্ররা আলাদা আলাদাভাবে ভোটে যাবে নাকি জোট-মহাজোটগতভাবে অংশ নেবে। বিএনপি ভোটে এলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে মহাজোট করাসহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট আরো সম্প্রসারণ হতে পারে। আর এ কারণে এখনো জোটের নিজেদের মধ্যে আসন বণ্টন চূড়ান্ত করা হচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রমতে, বিএনপি নির্বাচনে এলে ১৪-দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোটগতভাবে ভোট করা হবে। ড. কামাল হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যে বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এর অংশীদার হিসেবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগ জোট-মহাজোটে ধর্মভিত্তিক ও বাম ঘরানার দল এনে তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেবে। আর বিএনপি না এলে সবাই আলাদা আলাদা ভোট করবে। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে একটা সমঝোতা থাকবে। কোনো কারণে বিএনপির একাংশকে নির্বাচনে আনা গেলে, তখন ওই অংশের সঙ্গেও একটা অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা থাকবে। এ জন্য গত শনিবার অনুষ্ঠিত দলের নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে জেলায় জেলায় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনসহ বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ বলেন, ধারণা করছি, এ মাসেই বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, আর নিলেও কি প্রক্রিয়ায় নেবে, তা আরো স্পষ্ট হবে। তবে আমরা নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছি। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে গতবারের মতো জোটগতভাবে নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিএনপি অংশ না নিলে জাতীয় পার্টি বা আমাদের জোটের অন্য দলগুলো নিজ নিজ দলের ব্যানারে পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, সেটা তখন বোঝা যাবে।

বিএনপি ভোটে এলে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে বলে জানিয়েছেন। আর বিএনপি না এলে জাতীয় পার্টি এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচন করবে। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টি থাকবে বলেও দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাসীনদের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে, খালেদা জিয়াকে ছাড়াই বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। দলীয় সূত্রমতে, গত মার্চে তারেক রহমানের কাছে থেকে খালেদা জিয়া মুক্তি না পেলেও বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে প্রথম নির্দেশনা আসে। তখন থেকেই দলের মধ্যে এ ব্যাপারে প্রস্তুতি শুরু হয়। এ ব্যাপারে দল দ্বিধান্বিত থাকলেও নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া মুক্ত হতে পারবেন না—এমনটা ধরে নিয়েই এমন প্রস্তুতি। পাশাপাশি চলছে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, সহসাই খালেদা জিয়ার কারামুক্তির কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। আন্দোলনের মাধ্যমে এ মুহূর্তে তাকে মুক্ত করার সম্ভাবনাও কম। এমন ভাবনা থেকেই দলীয় সভা-সমাবেশে বক্তৃতায় তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচন বর্জনের কৌশলী বক্তব্য দিচ্ছেন। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি কোনোটাই সহজে মানবে না সরকার। তাই দাবি আদায়ে রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায়ে নানা তৎপরতা অব্যাহত রাখার কাজও চলছে। সম্প্রতি জাতিসংঘে রাজনৈতিক বিভাগের সহকারী সচিব ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি গত কয়েক মাসে পশ্চিমা দেশের ঢাকাস্থ সিনিয়র কূটনীতিকদের সঙ্গেও একাধিক গোপন বৈঠক করেছে দলের কূটনৈতিক উইং।

দলীয় সূত্রগুলো আরো জানায়, দল নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটসহ উদারপন্থি দল এবং যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঐক্য করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ঐক্য না হলে ২০ দলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে ৩০০ আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে। দলের সিদ্ধান্ত হচ্ছে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি যা-ই হোক, ন্যূনতম দাবি আদায় করে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে দল ইতিবাচক। পাশাপাশি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিশেষ করে তফসিল ঘোষণার পরও সরকারকে চাপের মুখে রাখার জন্য আন্দোলন করার পরিকল্পনা রয়েছে দলের।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, কঠোর আন্দোলনে না গিয়ে বিএনপি এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে জোরদার আন্দোলন করা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে দলে। নির্বাচনটাকে আন্দোলনে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই নেতা।

Share Button