নতুনেরডাক অনলাইন :

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে বিএনপি আন্তর্জাতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এমন তৎপরতা জোরালো করা হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তুলে ধরছে যে, সরকার আসন্ন নির্বাচনও গতবারের মতো একতরফা পথে হাঁটছে। ভোটের বছরে দলের নেতাকর্মীদের কারাগারে রেখে একনায়কতন্ত্র কায়েমের দিকে যাচ্ছে। সাংবাধিনক পদগুলোকে দলীয়করণ করা হয়েছে। এসব কথা জানিয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার শরণাপন্ন হয়েছে বিএনপি।

দলীয় কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা ও ভারতসহ প্রভাবশালী দেশের কাছে অভিন্ন ভাষায় চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোতে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ‘মিথ্যা মামলায়’ সাজা দিয়ে তাকে ছাড়াই আগামী সংসদ নির্বাচনে সরকারের ‘দুরভিসন্ধির’ কথা চিঠিতে উল্লেখ করেছে বিএনপি।

চিঠিতে বিরোধী দলের ওপর সরকারের দমনপীড়ন, খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা, মামলায় সরকারের হস্তক্ষেপ, এ মামলার রায়ের আগে-পরে সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতারসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ঢাকায় জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান সরকার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলে দাবি করলেও ক্ষমতা পেয়ে বেমালুম আরেকটি অবাধ নির্বাচনের কথা ভুলে যায় সরকার।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপির দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি আগামী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য ক‚টনীতিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, সরকার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে তা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে কল্পনা করা যায় না। অন্যদিকে, সরকারের বিভিন্ন সময় কম গণতন্ত্র ও বেশি উন্নয়নের তত্ত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা থাকলেও একটি দেশের সহযোগিতায় সেটি কাভার করতে পেরেছে সরকার, এমনটিও মনে করছেন অনেকে। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গুম-খুনসহ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়ায় বিষয়টি সামনে চলে আসে। তাছাড়া নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আর একে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে তৎপরতা বাড়িয়েছে বিএনপি।

বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলো নির্বাচনের স্বচ্ছতার ওপর নজর রাখে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিবেশী একটি দেশ ছাড়া প্রায় সব দেশ মেনে নিতে পারেনি। তার পরও সরকার গায়ের জোরে পাঁচ বছর অবৈধভাবে ক্ষতায় টিকে আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই সরকারে জনগণের মেন্ডেট নাই। আগামী নির্বাচনও একই সমস্যা সামনে এসেছে। এবার সেই ষড়যন্ত্রের মাত্রা আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি মিথ্যা মামলা সাজিয়ে আমাদের চেয়ারপারসনকে আটক করা হয়েছে। আমরা বিদেশি মাধ্যমগুলোতে জানানোর চেষ্টা করছি বর্তমান সরকার দমন-পিড়নের মাধ্যমে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের দিকেই হাঁটছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় জেলে যাওয়ার পর বিএনপি মহাসচিব দুই দফা প্রায় ২০টি দেশের ক‚টনৈতিকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সৌদি আরব, জাপান, জার্মানি, তুরস্ক, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ২০টি দেশ এবং সংস্থার রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকে দলের মহাসচিব বেগম জিয়ার মামলার রায় এবং সরকারের দুরভিসন্ধিগুলো তুলে ধরা হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘বিদেশি সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলো একটি দেশের নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনের পূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়কে ভাগ করে পর্যবেক্ষণ করে। তাই পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরে আমরা বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের সহায়তা চেয়েছি। জাতিসংঘে আমাদের যে অঙ্গীকারগুলো আছে যেমন : গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ভোটাধিকার, মানবাধিকার এখানে চরমভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। কমনওয়েলথের মূল্যবোধেরও পরিপন্থী কাজ হচ্ছে। চিঠিতে এ বিষয়গুলো রয়েছে।’

Share Button