অন্যান্য

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন
কুমিল্লায় ধানের শীষের বিশাল জয়

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

কুমিল্লার নগরপিতার আসনে আবারও বসছেন মো. মনিরুল হক সাক্কু। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যেও মেয়র পদে জয় পেয়েছেন বিএনপি মনোনীত এ প্রার্থী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে ১১ হাজার ৮৫ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখলেন সাক্কু। এ নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট। আর আঞ্জুম সুলতানা সীমা পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট। বৃহস্পতিবার রাতে বেসরকারি এ ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল। সিটি কর্পোরেশনের ১০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টির ফল ঘোষণা করেন তিনি। বাকি দুটি কেন্দ্রের ফল স্থগিত রয়েছে। স্থগিত হওয়া দুই কেন্দ্রের মোট ভোট দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধানের চেয়ে কম হওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বেসরকারিভাবে এ ফল ঘোষণা করেন।

রাজনীতির মাঠে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এমন ফল বিএনপির জনপ্রিয়তার অর্জন বলে মনে করছেন দলটির সংশ্লিষ্টরা। জয়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মো. মনিরুল হক সাক্কু সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসি ব্যর্থ, বিজয়ী হয়েছি জনগণের রায়ে। আমার এ বিজয় কুমিল্লাবাসীর বিজয়। গণতন্ত্রের বিজয়। আমাকে পরাজিত করার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। এ ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করেছেন নগরবাসী।’ তিনি বলেন, বিএনপি ও ধানের শীষ যে জনপ্রিয় তা আবারও প্রমাণিত হল।

তিনি বলেন- ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ১ লাখ ৭০ হাজার ভোট কাস্টিং হতো, আর কাস্ট ভোটের মধ্যে আমি পেতাম ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি।’ সাক্কুর অভিযোগ, সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন অধিকাংশ কেন্দ্রে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। আমিসহ দলের নেতারা প্রশাসনকে কারচুপির এসব ঘটনা অবহিত করলেও তারা তা পাত্তা দেয়নি।

অপরদিকে নির্বাচনে পরাজিত আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা তার বাসভবনে বৃহস্পতিবার রাতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভোটারদের এবং শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। এ সময় বিজয়ী মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকেও অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। তবে দলটির প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম রতন যুগান্তরকে বলেন, ‘দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই আমাদের প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে। আমাদের দলীয় কোনো কোনো নেতা ওপরে ওপরে প্রার্থীকে সমর্থন করলেও ভেতরে ভেতরে বিরোধিতা করায় এ ফল এসেছে।’ তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি।

কুমিল্লা সিটিতে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। এ নির্বাচনে ১০৩টি ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৫৬৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২ হাজার ৪৪৭ জন ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ৫ হাজার ১১৯ জন। নির্বাচনে ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯০ অর্থাৎ ৬৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ এবং মহিলা ভোটার। এ সিটিতে একজন নারী প্রার্থীকে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেয়ায় জয়ের ব্যাপারে দলটির নেতাকর্মীরা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। নির্বাচনের তফসিল শুরুর পর থেকে বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।

পক্ষান্তরে ভোট গ্রহণের সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের তৎপরতা তেমন একটা দেখা যায়নি। এমনকি অনেক ভোট কেন্দ্রে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর এজেন্টও ছিল না। দুপুরের পরপরই বিএনপির নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্রের আশপাশেও দেখা যায়নি। এক প্রকার ভোট কেন্দ্র ছেড়ে দেন দলটির নেতাকর্মীরা।

বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর টাউন হলে ফল ঘোষণা শুরু করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরাজয়ের আশঙ্কায় ফল ঘোষণার শুরুতে বিএনপির মেয়র প্রার্থীসহ দলটির সিনিয়র নেতাদের সেখানে দেখা যায়নি। অপরদিকে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী টাউন হলের আশপাশে জড়ো হয়ে নৌকার পক্ষে খণ্ড খণ্ড মিছিল ও স্লোগান দিতে থাকেন। তখন বিএনপির নেতাদের সেখানে উপস্থিতি তেমন দেখা যায়নি। একের পর এক কেন্দ্রের ফল ঘোষণায় বিএনপি এগিয়ে যাওয়ায় রাত সাড়ে ৭টার পর ফল ঘোষণার স্থানে আসতে থাকেন মো. মনিরুল হক সাক্কুসহ বিএনপির নেতারা। বিএনপির নেতাকর্মীরাও জড়ো হন সেখানে। ধানের শীষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রাতে নগরীতে ছোট ছোট মিছিল বের করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় সরকারভুক্ত নির্বাচন হলেও মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়। এ নির্বাচনে জয় পেতে মরিয়া হয়ে প্রচার চালায় উভয় দল। এ নির্বাচন ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উৎসবের পাশাপাশি শঙ্কাও ছিল। তবে ভোট গ্রহণ নিয়ে বিচ্ছিন্ন অনেক ঘটনা ঘটলেও নির্বাচনের ফলে স্বস্তি বিএনপি শিবিরে।

এর আগে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে নিজ নিজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা এবং বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু দিনভর নগরীর ভোট কেন্দ্রগুলো মনিটরিং করে দিন কাটিয়েছেন। সকাল থেকেই দুই প্রার্থী ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে বের হন। পরে সকাল ৯টার দিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু নগরীর ১২নং ওয়ার্ডের নবাব হোচ্চাম হায়দার উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। এ সময় ভোট গ্রহণে নানা অনিয়মের অভিযোগও আনেন মনিরুল হক সাক্কু। সাড়ে ৯টায় নগরীর ৮নং ওয়ার্ডের মডার্ন স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা। এরপর ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনে বের হন।

বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে নগরীর ২১নং ওয়ার্ডের আশ্রাফপুর এলাকার সরকারি সিটি কলেজ কেন্দ্রে ২০-২৫ জন আওয়ামী লীগ কর্মী ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কেন্দ্র দখল করে ৪ শতাধিক ভোট প্রয়োগ করলে কেন্দ্রটিতে ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়ে যায়। এ খবর পেয়ে বিএনপির প্রার্থী সাক্কু ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেন। পরে তিনি নগরীর সদর দক্ষিণ এলাকার নেওড়া, শাকতলা, উনাইসা, ঢুলিপাড়া, রাজাপাড়া, চৌয়ারা, গন্ধমতি এলাকা থেকে দলের পোলিং এজেন্ট ও কর্মীদের মাধ্যমে বিক্ষিপ্ত নানা ঘটনার খবর পেয়ে কেন্দ্রগুলোতে ছুটে যান। এসব কেন্দ্রে গিয়ে তিনি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নানা বিষয়ে অভিযোগ করেন। এ ছাড়া সাক্কু নগরীর প্রায় ৪৩টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এদিকে বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা। তিনি নিজ ভোট কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নগরীর প্রায় ৫৭টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় সীমা বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের নানা খবর পেয়ে তিনি এসব কেন্দ্রে ছুটে যান।

Sharing is caring!

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares